একটি মায়ের মৃত্যু!

মারবেই তো। আমার তো চাল নেই চুলো নেই, আমার তো কেউ নেই আমার কচি বাচ্ছাগুলো ছাড়া। আমি যে রুগ্ণ হতশ্রী দেখতে, গায়ে ময়লা, মুখের গড়নও লোকে বলে বিশ্রী। মুলোর মত দাঁতগুলো বেড়িয়ে থাকে বলে লোকে ভয় পায়। কথা বলতে গেলেও লোকে রেগে গিয়ে মনে করে গালি দিচ্ছি। আমার গলার স্বর তো তোমাদের মত ভদ্রতার চকলেট দিয়ে প্রলেপ দেওয়া নয়!

কেন মরতে হলো? বলি তাহলে। কাঁদবে না তো?

রাস্তার ধারে শুয়ে ছিলাম বাচ্ছাদের নিয়ে। যেতে আসতে মানুষের পা লেগে যায় মাঝে মধ্যেই। কিন্তু বাচ্ছাদের শিখিয়ে দিয়েছি যে ওতে কিছু হয়না। আমার মাও আমাকে শিখিয়েছিল। কিন্তু কেন ওই বাচ্ছাটা পাশ দিয়ে যেতে যেতে হঠাৎই চিৎকার করে উঠলো জানিনা। ঘুম ভেঙে গেলো আমার ও বাচ্ছাদের। ভয়ে কঁকিয়ে উঠলো আমার বাচ্ছারা। তারপরই শুরু হল আমার শেষ।

কেন যে বাচ্ছা মেয়েটা চেঁচাল হাথ পা ছুড়ে, বুঝলাম না। কেন যে ওর মা আরও তীব্র চিৎকার করে মেয়ের হাথ ধরে হ্যাঁচকা মারলো। ডেকে উঠে হাত বাড়ালাম, “আরে আরে কর কি! ছোট বাচ্ছা না?” আমার বাচ্ছারাও লাফিয়ে গেল আগলাতে–মেয়েটা যেন পড়ে না যায়, এই ভেবে। আমি মনে মনে ভাবলাম, এই শেষ। ভাবতে ভাবতেই কোথা থেকে লাঠির ঘা পড়তে শুরু করলো। তারপর, তীব্র যন্ত্রণাতে আমার আর মাথা কাজ করলো না। প্রাণপনে আত্মরক্ষা করলাম। রেগে গেলে আমার সামনে কেউ দাঁড়াতে পারেনা যতক্ষন শরীরে শক্তি আছে, লড়ে যাই। বাচ্ছাদের তো রক্ষা করতে হবে!

কিন্তু পারলাম না। হটাৎ দেখতে পেলাম আমার রক্তাক্ত দেহ পড়ে আছে ফুটপাতে। আমি অবাক। ভাবতেই পারছিলাম না ওটা আমার দেহ। চিনতে পারলাম আমার চারটে অবশিষ্ট বাচ্ছাদের দেখে। ওরা তো কিছু না বুঝেই তখন আমার মৃত দেহ থেকে দুধ খেয়ে যাচ্ছে।

আমি তখন অশরীরী। ডেকে বলতেও পারছিনা ওদের। ধাক্কা দিয়ে সরিয়েও দিতে পারছি না মানুষের পথ থেকে। দেখতে দেখতে একটা বাইক চড়ে এলো ফুটপাতে এবং অসাবধানে মেরে পিঠ ভেঙে দিলো কালীর। কালী আমার সবচেয়ে প্রিয়। আমারই মত পুরো কালো।

হঠাৎ দেখলাম আমার পিতা কাল ভৈরবকে। এসে আমায় তুলে নিয়ে চলে গেলেন। পড়ে রইলো দেহ আর আমার প্রাণের বাছাগুলো। উনি বললেন, “কাঁদিস না। মানুষ হয়ে যে পাপ করেছিলি তারই শাস্তি পেলি। তুইও একটা বেজিকে পিটিয়ে মেরেছিলি যখন তুই মানুষ ছিলি। তোর বাচ্ছাদের সাজা কম। তারা আর কিছুক্ষনের মধ্যেই এসে যাবে তোর পাশে।

জিজ্ঞাসা করলাম পশুপতিকে, “আর যারা আমায় মারলো, তাদের সাজা?”

বললেন, “হচ্ছে, হচ্ছে। তাদেরও হচ্ছে। তাদের কপালে শাস্তি হবে সারা জীবন ধরে। মানুষকে কি ৮০ বছর আয়ূ এমনি দিয়েছি? তার উপর এখন নিজেরাই আয়ু বাড়িয়ে নিচ্ছে চিকিৎসা বিদ্যার বলে; করোনাকে আটকাক তো দেখি মুরোদ কত। হবে, হবে…সবার সাজা হবে।”