১৯ মে ২০২৬ তারিখে পথকুকুর সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের আদেশ

১৯ মে ২০২৬ তারিখে পথকুকুর সংক্রান্ত সুপ্রিম কোর্টের আদেশকে ঘিরে দেশজুড়ে ব্যাপক বিভ্রান্তি, আবেগপ্রবণ প্রতিক্রিয়া এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ভুল ব্যাখ্যা ছড়িয়েছে। কিছু মহল এই রায়কে এমনভাবে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে যেন এটি পথকুকুরদের জনসমাগমস্থল থেকে তুলে দেওয়া, নির্বিচারে সরিয়ে ফেলা, তাড়িয়ে দেওয়া বা এমনকি হত্যা করার অনুমতি দিয়েছে। এই ব্যাখ্যা আইনগতভাবে ভুল এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক।

সুপ্রিম কোর্ট ভারতের বিদ্যমান আইন পরিবর্তন করেনি। Prevention of Cruelty to Animals Act, 1960 এবং Animal Birth Control (ABC) Rules এখনও সম্পূর্ণ বলবৎ রয়েছে। সুস্থ পথকুকুরদের এখনও বেআইনিভাবে হত্যা, বিষপ্রয়োগ, মারধর বা নির্বিচারে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া যায় না। এই রায় কোনো আবাসন সমিতি, পৌরসভা, বেসরকারি গোষ্ঠী বা ব্যক্তিকে কমিউনিটি ডগ বা তাদের দেখাশোনা করা মানুষদের বিরুদ্ধে আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়ার অনুমতি দেয়নি।

আসলে আদালত যা করেছে তা হল আগের কিছু পর্যবেক্ষণে যে অত্যন্ত কঠোর ও আপত্তিকর সুর দেখা গিয়েছিল, সেখান থেকে অনেকটাই সরে এসে দায়িত্বটি আবার সরকার ও পৌর কর্তৃপক্ষের ওপর ফিরিয়ে দিয়েছে। আদালত পুনরায় স্পষ্ট করেছে যে পথকুকুরের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে বৈজ্ঞানিক, মানবিক এবং আইনসম্মত উপায়ে — বিশেষ করে বন্ধ্যাকরণ, অ্যান্টি-রেবিস টিকাকরণ এবং সংগঠিত প্রাণী পরিচর্যা ব্যবস্থার মাধ্যমে।

একই সঙ্গে আদালত ‘ইচ্ছা’  করেছে যে বাসস্ট্যান্ড, রেলস্টেশন, বিমানবন্দর, হাসপাতাল, স্কুল বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চত্বরের মতো সংবেদনশীল জনপরিসর থেকে পথকুকুরদের সরিয়ে আশ্রয়কেন্দ্র বা প্রাণী পরিচর্যা কেন্দ্রে রাখাই বাঞ্ছনীয়। কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, এই দায়িত্ব আদালত সরকার ও পৌর কর্তৃপক্ষের ওপর ন্যস্ত করেছে, সাধারণ মানুষের ওপর নয়। অর্থাৎ, যদি প্রশাসন এই ধরনের জায়গা থেকে কুকুরদের স্থায়ীভাবে সরিয়ে রাখতে চায়, তাহলে তাদেরই প্রয়োজনীয় অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে।
কিন্তু বাস্তবে এই কাজ এত সহজ নয়। আদালতের এই “ইচ্ছা”কে সারা দেশে কার্যকর নির্দেশে পরিণত করতে গেলে বিপুল করদাতার অর্থ ব্যয় হবে। কোটি কোটি কুকুরের জন্য জমি, বড় আশ্রয়কেন্দ্র, পশু চিকিৎসা পরিকাঠামো, প্রশিক্ষিত কর্মী, পরিবহণ ব্যবস্থা, বন্ধ্যাকরণ ইউনিট, খাদ্য সরবরাহ এবং দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বিশাল অর্থের প্রয়োজন হবে। অথচ এই বিপুল আর্থিক ও বাস্তব সমস্যাগুলি কতটা কার্যকরভাবে সামাল দেওয়া সম্ভব, সে বিষয়ে রায় কার্যত নীরব।

এটাও স্পষ্ট যে বিষয়টি দেশজুড়ে অত্যন্ত বিতর্কিত হয়ে উঠেছিল। প্রাণীপ্রেমী সংগঠন, পশু চিকিৎসক, আইনজীবী এবং কোটি কোটি প্রাণীপ্রেমীর তরফে তীব্র আপত্তি উঠেছিল, কারণ আশঙ্কা তৈরি হয়েছিল যে আগের কিছু মন্তব্যকে অজুহাত করে অনেকেই পথকুকুরদের ওপর নিষ্ঠুরতা চালাতে পারে। শেষ পর্যন্ত আদালত এই দীর্ঘস্থায়ী নীতিগত দ্বন্দ্ব থেকে নিজেকে অনেকটাই সরিয়ে নিয়ে মামলাটি বন্ধ করে দেয় এবং জানিয়ে দেয় যে এই বিষয়ে আর কোনো শুনানি তারা করবে না।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, আদালত বলেছে ভবিষ্যতে পথকুকুর সংক্রান্ত অভিযোগ, বিরোধ বা বাস্তবায়নজনিত সমস্যাগুলি সংশ্লিষ্ট হাইকোর্টগুলিতে তোলা উচিত। অর্থাৎ, এই বিষয়ে আইনি লড়াই শেষ হয়ে যায়নি। দেশের বিভিন্ন হাইকোর্ট এখনও পরীক্ষা করে দেখতে পারে কোনো পৌরসভার পদক্ষেপ ABC Rules, সাংবিধানিক অধিকার বা প্রাণী সুরক্ষা আইন লঙ্ঘন করছে কিনা।
প্রাণীপ্রেমী ও ফিডারদের জন্য মূল বার্তা একটাই — কমিউনিটি ডগদের আইনগত সুরক্ষা এখনও বহাল রয়েছে। দায়িত্বশীলভাবে নির্বীজিত ও টিকাপ্রাপ্ত পথকুকুরদের খাওয়ানো ও দেখাশোনা করা এখনও আইনসম্মত। আর যারা ভেবেছিলেন এই রায় পথকুকুরদের বিরুদ্ধে হিংসা বা বেআইনি উচ্ছেদের লাইসেন্স দিয়েছে, তাদের জন্যও বার্তা পরিষ্কার — নিষ্ঠুরতা এখনও দণ্ডনীয় অপরাধ এবং আইন এখনও পথপ্রাণীদের সুরক্ষা দেয়।

সব মিলিয়ে, এই রায়কে পথকুকুরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ হিসেবে দেখা ভুল হবে। বরং এটি বহু বছর ধরে সরকারগুলির মানবিক বন্ধ্যাকরণ ও টিকাকরণভিত্তিক নীতি কার্যকর করতে ব্যর্থতার একটি স্বীকৃতি।

আদালতের সম্পূর্ণ আদেশ পড়ার জন্যে ক্লিক করুন https://rkdpetshop.com/wp-content/uploads/2026/05/131-pages-19-MAY-26-SC-JUDGEMENT.pdf